১
বাসস্ট্যান্ডে পা রাখা মাত্র আমায়
ছেঁকে ধরল ট্যাক্সিওয়ালাদের ছোটখাটো একটি জনতা।“দার্জিলিং মিরিক গ্যাংটক কালিম্পং” যে চুলোয় আমি যেতে চাই ,সেখানেই তারা আমায় পৌঁছে
দেবে ,পছন্দসই হোটেল ও জোগাড় করে দেবে ।অবশ্য দার্জিলিং এ থাকার জন্য হোটেল আমি
কলকাতায় বসেই বুক করে এসেছি শোনামাত্র গাড়িওয়ালাদের ভীড় পাতলা হয়ে গেল – তারা ইতস্তত
ছড়িয়ে পড়ল পছন্দ মাফিক অন্য যাত্রীর সন্ধানে। পড়ে রইল শুধু রোগা পটকা একটা লোক ।
সে যাবে দার্জিলিং এ ।তার টাটা সুমোয় আর একটা সীটই খালি আছে । আমি সওয়ার হয়ে বসা
মাত্র সে গাড়ি ছেড়ে দেবে – ভাড়া লাগবে একশো পঁচিশ টাকা।
আমি হ্যাঁ বা না কিছু বলার আগেই দেখি সে কখন আমার সুটকেসটাকে নিজের দখলে
নিয়ে নিয়েছে এবং হনহনিয়ে হাঁটা দিয়েছে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি টাটা সুমো গাড়ির
দিকে । লোকটির এই তৎপরতা আমার ভাল লাগলনা । দিনকাল ভাল নয় – লোকটা যদি এখন
আমার সুটকেস নিয়ে উধাও হয়ে যায় তা হলে একমাত্র চিৎকার করে লোক জড়ো করা ছাড়া আর
কিছুই করতে পারবনা আমি । তবে তেমন অঘটন কিছু ঘটলনা । আমি তার টাটাসুমো গাড়ির কাছে
পৌছতে পৌছতে লোকটি আমার সুটকেসটিকে চালান করেদিয়েছে গাড়ির মাথায় । এমন কি বেড়াতে
এসেছি বলে সে সামনের সীটে বসে থাকা এক আরোহিকে বিশেষ অনুরোধ করে পেছনের সীটে
পাঠিয়ে দিয়ে সামনের সীটে জানালার ধারের আসনটি আমার জন্য খালি করিয়ে দিল । আসনচ্যুত
সহযাত্রীটি ও দেখলাম বিনা প্রতিবাদে মেনে নিল ড্রাইভারের অনুরোধ ! কোন অজানা অচেনা
লোকের জন্য এমন বদান্যতা চটকরে চোখে পড়েনা আজকাল।তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি উঠে
বসলাম ড্রাইভারেরা পাশের আসনে ।
২
গাড়ি ছুটে চলল এবার ব্যস্ত শিলিগুড়ি শহর ছাড়িয়ে হিলকার্ট রোড ধরে । সমতল
পথেই গাড়ি চলেছে –
দ্রুত গতিতে পিছনে সরে সরে যাচ্ছে দোকানপাট ছোট ছোট ঝুপড়ি মত চায়ের ঠেক,সাইকেল
সারাইএর দোকান । বেশ খানিকটা দূর চলার পর এখন আর লোকালয় চোখে পড়ছেনা । তাদের
পরিবর্তে দেখা যাচ্ছে দু একটা ছোটো ছোটো চা বাগান – সে সব ছাড়িয়ে আর দূরে দিগন্তে আবছা দেখা যাচ্ছে
নীলকান্ত পাহাড়ের সারি ।আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাব ওই গিরিশ্রেণীর নিচে
।সেখান থেকে শুরু হবে পাহাড়ের গা বেয়ে চড়াই এর পথ ।সে পথের বাঁকে বাঁকে পাহাড় তার
রূপের ডালি পরতে পরতে মেলে ধরবে আমার চোখের সামনে । গাড়ির যাত্রীদের মধ্যে এক আমি
ছাড়া বাকি ন’জন
ই কোন না কোন সরকারি দপ্তরের কর্মী , দার্জিলিং এ চলেছেন দপ্তরের কাজে । তারা মেতে
রইলেন নিজেদের অফিসের গল্পে ।
আমি ভাবছিলাম পুরনো দিনের কথা । ছাত্রজীবনে কলেজের ব্যবস্থাপনায় যখন এ
তল্লাটে বেড়াতে এসেছিলাম তখন শিলিগুড়ি থেকে আদ্দিকালের ল্যান্ডরোভার গাড়িতে
নিজেদের বাক্স বিছানার সঙ্গে গাদাগাদি করে বসে অতি কষ্টে পৌঁছেছিলাম দার্জিলিং এ ।
মালপত্র সহ সাত আট জন ছেলেমেয়ের বসার পক্ষে গাড়ির ভিতরে যথেষ্ট জায়গা ছিলনা।তাই
যাত্রাটা খুব সুখকর হয়েছিল তা বলতে পারিনা ।তার ওপরে পাহাড়ে ওঠার সময় পাকদন্ডী পথে
আমাদের অনেকের ই গা-বমি ভাব লেগেছিল ।গাড়ির নেপালি চালক আমাদের আস্বস্ত করেছিল এই
বলে যে সমতলের মানুষদের অনেকেরই পাহাড়ে ওঠার সময় এ ধরনের শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়
। ওতে চিন্তার কোন কারণ নেই । অবশ্য ওই বয়েসে এমন অনেক ছোটো খাটো অসুবিধে অনায়াসে উপেক্ষা
করা যায় । ওই চাপাচাপির মধ্যেই গাড়ির ছোট্ট জানালা বা মালপত্রের ফাঁক ফোকর দিয়ে হিলকার্ট
রোডের দুপাশের প্রাকৃতিক শোভা । নিবিড় অরণ্যময় পাহাড়ি প্রকৃতির বিশালত্ব আর অতলান্তিক নিস্তব্ধতা দিয়ে আমার
সমগ্র চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল । এবারে দেখছি সবই উল্টো । পাকদণ্ডী পথের
চারপাশে সবকিছুই কেমন যেন বিবর্ণ –ধুসর ! বেশ অনেকটা চড়াই পথ পার হবার পর ও সব কিছুই কেমন
যেন শ্রীহীন লাগছে ।পথের কোন বাঁকেই কোন চমক নেই ।হয়ত সত্যি ছিলনা কোনকালেই ।
সবটাই ছিল আমার নবীন চোখের মায়া আবরণ ! বয়স
বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের ওপর থেকে সরে গেছে প্রথম যৌবনের মোহাঞ্জন – ভোঁতা হয়ে
গেছে অন্তরের বিষ্ময়বোধ ।তাই হয় তো এখন আর সহজে মন ভোলেনা । আবার সেই সঙ্গে আরো
একটা জিনিষ ঘটে গেছে এই চুয়াল্লিশ বছরের ব্যবধানে । দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে
তাল মিলিয়ে পাহাড়েও বেড়েছে জনসংখ্যা ।সেই বাড়তি জনসঙ্খ্যার চাপে দিনে দিনে একটু
একটু করে ক্রমশ পিছু হটেছে প্রকৃতি । রাস্তার ধারে ধারে এত দোকান পাট ,এত ঘরবাড়ি
তো চোখে পড়েনি আগের বার ।সেবারে দেখেছিলাম রাস্তার এক পাশে খাড়া পাহাড়ের দেওয়াল আর
অপর দিকে গভীর খাদ । এতটাই গভীর সে খাদ যে সে দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দুরুদুরু
করে ওঠে বুক । এবারে তাকে আর ততটা ভয়ঙ্কর লাগছেনা তো ! খাদের কিনার ঘেঁষে এক একটি
চুলের কাঁটার মত বাঁক নেবার সময়ে যে শিহরণ অনুভব করেছিলাম আগের বার সে শিহরণ
জাগলনা একবারের তরেও ।
কখন যে কার্সিয়াং পার হয়ে গেছি টের পাইনি । চেনা
পাহাড়ী প্রকৃতির দেখা পেলাম ঘুম এর কাছাকাছি পৌঁছে । রাস্তার বাঁদিকে দেখা গেল ক্রিপ্টোমেরিয়া
গাছের ঝাঁক । বিশাল লম্বা লম্বা গাছগুলো যেন আগন্তুকদের গার্ড অফ অনার জানানর জন্য
পথের ধারে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে টানটান হয়ে । গাছগুলোর ফাঁক গলে কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ার মত সাদা মেঘের দল গজেন্দ্র গমনে বেরিয়ে
আসছে –
ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে চার পাশে । ক্রমশঃ ঝাপসা হয়ে আসছে চারপাশ । হাল্কা শীতের
আমেজ টের পাওয়া গেল এবারে । সহযাত্রীদের দেখলাম নিজের নিজের ব্যাগ থেকে গরম জামা
বের করে গায়ে চড়িয়ে নিচ্ছেন ।
৩
বাস থেকে নামার আগেই সুটকেস থেকে আমি গরম জ্যাকেট বার করে হাতে রেখেছিলাম ,
এতক্ষণ সেটা আমার কোলের অপরে রাখা ছিল ।আমিও সেটা গায়ে চড়িয়ে জিপটা টেনে দিলাম একেবারে
গলা অবধি।এই রকম প্রাকৃতিক পরিবেশই তো এই পাহাড়ী এলাকায় প্রত্যাশা করেছিলাম ।
কিন্তু আরো একটু এগোতে না এগোতেই ক্রিপ্টমেরিয়া গাছেরা অদৃশ্য হয়ে গেল । তার বদলে
দেখা দিল অজস্র দোকান পাটে ভরা একটা বাজার । অনেক লোকের ভীড় সেখানে । ছোট ছোট দলে
ভাগ হয়ে ইউনিফর্ম পরা নানা বয়সী ছেলে মেয়ে পিঠে স্কুলব্যাগ ঝুলিয়ে হৈ হৈ করতে করতে
স্কুলে চলেছে ।
সমুদ্র তল থেকে প্রায় সাড়ে সাতহাজার ফুট উচ্চতায় উঠে পৌঁছলাম ঘুম । সামনেই
ঘুম রেলস্টেশন । দূর থেকে মেঘের আস্বচ্ছ ওড়নায় ঢাকা জরাজীর্ণ স্টেশনটা হানাবাড়ির
মত দেখতে লাগল । লোকজন বিশেষ নেই – শুধু একটা ইঞ্জিন স্টেশনের টিনের ছাউনি থেকে গলা বাড়িয়ে
যেন হিলকার্ট রোডে লোক চলাচল দেখছে ঘর
বন্দী চঞ্চল বালকের্ মত । এটাই নাকি পৃথিবীর সব চাইতে উঁচুতে অবস্থিত রেলস্টেশন ।
প্রথমবার যখন এই জায়গায় এসেছিলাম তখন জায়গাটায় এত ঘরবাড়ি ছিলনা । হাড়কাঁপান ঠান্ডা
আর নিঝুম নীরবতার জন্যে জায়গাটাকে একটা হিমশীতল মৃত্যু পূরীর মত মনে হয়েছিল । যেন
কোন এক মায়াবী দানবের মায়াপ্রভাবে গোটা জনপদটা গভীর ঘুমে অচৈতন্য হয়ে আছে ।
জায়গাটার নামের সঙ্গে তার চরিত্রের এক অদ্ভুত মিল যেন খুঁজে পেয়েছিলাম।
ঘুম রেল স্টেশন ছাড়িয়ে আরো কিছুটা এগিয়ে যাবার পর দেখি ছোট্ট এই টুকু একটা
ইঞ্জিন তার চোঙাদিয়ে ভুস ভুস করে প্রচুর পরিমাণে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ,আর থেকে থেকে
হুইসল বাজাতে বাজাতে তিনটে ছোটো ছোটো কামরাকে টেনে নিয়ে হেলতে দুলতে চলেছে ঘুম
স্টেশনের দিকে । ট্রেনের চলন দেখে আমার বাচ্ছাদের খেলনার কথাই মনে পড়েগেল । ঠিক
যেন এক সার দম দেওয়া খেলনা হাঁস দুলতে দুলতে এগিয়ে চলেছে । এককালে দার্জিলিং এর
যাত্রীদের নিয়ে সকাল নটায় নিউজলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে রওয়ানা হয়ে বিকেল চারটে নাগাদ
দার্জিলিং এ পৌঁছত । দূরত্বের তুলনায় সাতঘন্টা সময় অবিশ্বাস্য রকমের বেশি । একালের
টুরিস্টরা পথে আর অতটা সময় অপচয় করতে রাজি নয় ।তারা শিলিগুড়ি অথবা নিউ জলপাইগুড়ি
থেকে আমার মত ট্যাক্সি অথবা বাসে চেপে তিন-সাড়ে তিন ঘন্টায় দার্জিলিং পৌঁছে যায় ।
কাজেই পর্যাপ্ত যাত্রীর অভাবে আজকাল নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং অবধি থেকে টয়
ট্রেন আর চলেনা । তবে যুক্তি যাই বলুক , সময় যতই লাগুক আমি কিন্তু সূযোগ পেলে আজও
ওই টয় ট্রেনেই যাওয়াটাকে অগ্রাধিকার দিতাম। কারণ ধীরে ধীরে একটু একটু করে পাহাড়ে
ওঠার ফাঁকে অনেকটা সময় কাটাতে পারতাম আরণ্যক প্রকৃতির সঙ্গে ।
প্রথম যে বার কলেজ ছাত্র হিসেবে
এসেছিলাম তার সাত-আঠ মাস আগে এই পাহাড়ে নেমেছিল বিধ্বংসি ধ্বস – ব্যপক খয়ক্ষতি
হয়েছিল সেবারের প্রাকৃতিক দুর্যোগে । লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল জনজীবন – রাস্তাঘাট
।দার্জিলিং এ যাবারও পথে প্রকৃতির সেই ধ্বংসলীলার কিছু কিছু নিদর্শন চোখে পড়েছিল
আমাদের । যে টুকু দেখেছিলাম তাতেই শিউরে উঠেছিলাম প্রকৃতির উন্মত্ততার নমুনা দেখে
। বাতাসিয়া লুপের কাছে একটি জায়গায় দেখেছিলাম পাহাড়ের ওপর থেকে দুরন্ত গতিতে ধেয়ে
আসা বোল্ডারের আঘাতে ছিন্নভিন্ন রেল লাইন স্থানচ্যুত হয়ে ঝুলছে পাশের খাদে !
দুর্যোগ কেটে যাবার সাত কি আট মাস পরে মাটির চাঙ্গড় ,পাথরের বোল্ডার ইত্যাদি পরিস্কার
করে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা গেলেও বিদ্ধস্ত রেল পরিসেবা তখনও সারাই করে
ব্যবহারোপযোগি করে তোলা সম্ভব হয়ে ওঠেনি । কাজেই সেবারে আমাদের সামনে কোন সুযোগ ই
ছিলোনা ঐতিহ্যবাহী দার্জিলিং হিমালয়ান রেল পথের ছোট গাড়িতে চড়ার ।খুব আফসোস হয়েছিল
।কিন্তু আমাদের সেই উনিশ কুড়ি বছর বয়সী মন
ছিল বহতা নদীর মত সজীব – সচল ।
৪
পরে আবার কোনদিন যখন এখানে আসব তখন এ খেদ মিটিয়ে নেব –এই ভাবনাটা মনে
কোন অপ্রাপ্তির বেদনাকে বাসা বাধতে দেয়নি । এ যাত্রায় হয়ত সেই অপূর্ণ সাধ মিটিয়ে নিতে পারব
। আমার সহযাত্রীদের কথপোকথন থেকে জানতে পেরেছি যে প্রাতি দিন দু জোড়া ট্রেন টুরিস্টদের
মনরঞ্জনের জন্য দার্জিলিং ও কার্শিয়াং এর মধ্যে চলাচল করে । অনেকেই সেই জয় রাইডে
চড়ে দার্জিলিং থেকে গিয়ে কার্শিয়াং বেড়িয়ে আসেন । তবে আমার মনে এ ব্যপারে কোন
উৎসাহ জাগলনা ।পথের অবস্থাটা তো দেখতেই পেলাম ।
ঘুম থেকে দার্জিলিং প্রায় একহাজার ফুট নিচে ।দূরত্বের হিসেবে সাত কি আট
কিলোমীটারের মত হবে ।সেই পথটুকু অতিক্রম করতে খুব একটা সময় লাগলনা । ঢালু পথে
গড়াতে গড়াতে অচিরেই পৌঁছে গেলাম দার্জিলিং এর উপকন্ঠে । দার্জিলিং রেল স্টেশন পার
হয়ে এইচ ডি লামা রোড ধরে ট্যাক্সি বাজারের মধ্যে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াল ।
ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে নিজের সুটকেসের মালিকানা ফিরে পাবার পর পরই যে চিন্তাটা
মাথায় জাগল তা হল মহাকাল নামক সরাইখানাটি ঠিক কোথায় এবং সেখানে পৌঁছনর পথ কে বাতলে
দেবে আমায় ।
একটা বন্ধ দোকানের সামনে এসে ট্যাক্সিটা থেমেছিল । সেই দোকানের বন্ধ শাটারে
হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল সিড়িঙ্গে মার্কা একটা লোক । সামনে তাকে দেখে তার কাছেই
প্রশ্নটা রাখলাম ।লোকটি সামনের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে জানাল যে ওই রাস্তাদিয়ে
খানিকটা গিয়েই বাঁহাতে ঘুরলে এই রাস্তার ওপরে অবস্থিত রবার্টসন রোড – সেই রাস্তার
ওপরেই মহাকাল হোটেল । সে ভাবে যেতে গেলে একটু হাঁটতে হবে –“ তার চেয়ে ভাল
হবে বাবু যদি একটা কুলি করে নেন ,সে বমাল আপনাকে শর্টকাট রাস্তা দিয়ে হোটেলে পৌঁছে
দেবে”
।
কথাটা আমার মনে ধরল । কিন্তু কুলি পাই কোথায় ? সেই সিড়িঙ্গে মার্কা লোকটি
সে সমস্যার সমাধান ও বাৎলে দিল । সেইই কুলি তথা পথপ্রদর্শক হয়ে আমাকে হোটেলে পৌঁছে
দিতে রাজি । কুলিভাড়া লাগবে পঞ্চাশ টাকা ।
আমার লগেজ বলতে ছিল হাল্কা একটি মাত্র চাকা লাগান সুটকেস।সেই মাল বওয়ার
জন্য পঞ্চাশ টাকা !! কিন্তু দরদস্তুর করে আমি জীবনে কোনদিনই জিততে পারিনি কাজেই এ
ক্ষেত্রে দরদস্তুর করতে যাওয়ার কোন মানে হয়না । রাজি হয়ে গেলাম লোকটির কথায় ।
লোকটি সঙ্গে সঙ্গে কোমরে জড়ান গামছা জাতীয় একটা কাপড় খুলে নিয়ে তাই দিয়ে
সুটকেসটাকে বেঁধে পিঠের ওপরে ঝুলিয়ে নিয়ে এগিয়ে গেল সামনের একটি সিঁড়ির দিকে ।
খাড়া সিঁড়ি দিয়ে যে দ্রুততার সঙ্গে লোকটি তরতরিয়ে উঠেই চলেছে ধাপের পর ধাপ ,আমার
সাধ্য কি তার সঙ্গে পাল্লা দিই । অগত্যা পিছন থেকে কাতর কন্ঠে মিনতি জানাই – লোকটি যেন তার
চলার গতি একটু কম করে ।
আমার অনুরোধে লোকটি তার গতি কমালো বটে কিন্তু মুখ না ঘুরিয়েই কিছুটা
তিরস্কারের স্বরেই বলল এটুকূ চড়াই পথ চলতেই
ক্লান্ত হয়ে পড়লে দার্জিলিং এ বেড়াবেন কি করে ? এখানে তো প্রতিপদে চড়াই
উৎরাই ভেঙ্গে চলতে হবে ।
লোকটির কথায় আমার আত্মাভিমানে ঘা লাগলেও পরিস্থিতির বিচারে নীরবে খোঁচাটুকু
তখনকার মত হজম করে নিয়ে যতটা সম্ভব দ্রুততার সঙ্গে লোকটিকে অনুসরণ করে চললাম সিঁড়ি ভেঙে।তবে কপালগুণে
একেবারে বেদম হয়ে পড়ার আগেই খানদেড়েক খাড়া সিঁড়ি ভেঙে ,কিছুটা গলিপথ পার হয়ে পৌঁছে
গেলাম অভীষ্ট গন্তব্যে । বাইরে থেকে রবার্টসন রোডে মহাকাল হোটেলের চেহারা দেখে
একটু দমে গেলাম । অত্যন্ত শ্রীহীন ভাঙাচোরা একটা দোতলা বাড়ির একতলায় রিসেপশন ,
ডাইনিং হল আর কিচেন । লম্বাটে বাড়িটার একপাশে দোতলায় ওঠার সিঁড়িটা এমন ভাবে বানানো
,যে হঠাৎ দেখলে মনে হবে যেন একটা মই দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে রাখা আছে । কিন্তু
অপছন্দ হলেও এখন আর কিছু করার নেই । কলকাতায়
৫
ট্র্যাভেলিং এজেন্টের মাধ্যমে বুক করেছিলাম হোটেল। যে কয়দিন এখানে থাকব তার
ভাড়া বাবদ দেয় পুরো টাকাটাই মিটিয়ে দেওয়া আছে।অতয়েব এখন আর পরিবর্তনের উপায় নেই ।
চেক ইন পর্ব সেরে দোতলায় আমার জন্য বরাদ্দ করা ঘরটা অবশ্য মন্দ নয় । গোটা ঘরের
মেঝেতে পাতা বেশ পুরু লাল কার্পেট ।পরিস্কার বাথরুম ,ধবধবে সাদা নরম গদিওয়ালা বিছানা
আর শীতের কামড় থেকে রক্ষা পাবার জন্য একজোড়া ভারি সুন্দর দেখতে নরম তুলতুলে পশমের
কম্বল ছাড়া আর কিই বা চাইবার থাকে চলতি পথের ধারের সরাইখানায় ! শুধু একটাই খুঁত
খুঁতুনি রয়ে গেল ।ঘরে একটি মাত্র ছোট্ট জানলা ,তাও আবার সে জানালা দিয়ে দৃষ্টি
ছাড়া পায়না বেশিদূর ,বাঁধা পড়ে যায় হোটেলের ঠিক পিছনের লাগোয়া বাড়িটার টিনের চালে
। ঘরের বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েও নিস্তার নেই । সরু রাস্তাটার অপর পারে
সারবেঁধে একগাদা বাড়ি খাড়া দাঁড়িয়ে আকাশটাকে আড়াল করে রেখেছে । আকাশাটাকে এখানে
যেন এরা একেবারে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে । মনে আছে এর আগেরবার আমরা সকালে ঘুমচোখ খুলেই বিছানায় শুয়েই কাচের জানালা
দিয়ে দেখতে পেতাম নীল আকাশের পটে হাল্কা সোনালি রঙে আঁকা কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ
সৌন্দর্য । অপার্থিব সে দৃশ্য দেখতে পাওয়ার আনন্দ সারা জীবনে ভোলার নয় । বুঝলাম
এযাত্রায় সে সুখ আমার কপালে লেখা নেই ।
হোটেলের ঠিক সামনেটায় অপ্রসস্ত যে টুকু খোলা জায়গা আছে সেটুকুও দখল করে
নিয়েছে একগাদা ঝকমকে হাল আমলের ছোট বড় নানান গাড়ির ভীড় । বোঝাই যায় গাড়িগুলি ভাড়ায়
খাটে –
বেড়াতে আসা টুরিষ্টদের বেড়াতে নিয়ে যায় পাহাড়ে দর্শনীয় জায়গা গুলিতে । হোটেল ও
নিশ্চই ভাড়ার একটা হিস্যা পায় আর সেই জন্যেই হোটেলের আবাসিকদের যাতায়াতের অসুবিধা
হওয়া সত্বেও হোটেলের প্রবেশ দ্বারের সামনে জায়গাটাকে অমনভাবে গাড়ি পার্কিং এর জন্য
ব্যবহার করতে দেয় । দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর সামান্য বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম
হোটেল থেকে । হোটেলের সামনে রাখা গাড়ির অরণ্য ভেদ করে ডান হাতে কিছুদূর হাঁটতেই
একটা তেমাথার মোড়ে এসে পড়লাম ।রাস্তাটা এখানে ইংরেজি “Y”এর আকৃতি
নিয়েছে ।ওয়াই এর একটা বাহু হল রবার্টসন রোড এবং অন্য বাহুটি
হল গান্ধী রোডের একাংশ ,যা ম্যালের দিকে চলে গেছে । আর লেজের দিকটা চলেগেছে
জলাপাহাড়ের দিকে ।এই তেমাথাতেই আবার একধাপ নীচে থেকে নেহেরু রোড উঠে এসে যোগ
দিয়েছে ।
দুই
আমি যেখানে দাঁড়িয়ে রাস্তাগুলোকে চিনে নেবার চেষ্টা করছিলাম ঠিক তার নিচের
ধাপে নেহেরু রোডের ওপরে অবস্থিত একটা পাথরের ব্লক গেঁথে তৈরি একটা পুরনো গির্জার
ঘড়িওয়ালা চুড়াটা গান্ধী রোডের থেকে কিছুটা ওপরে এসে শেষ হয়েছে । হটাৎ দেখলে মনে
হতে পারে নিচের রাস্তার গির্জাটা যেন জিরাফের মত লম্বা গলাটাকে বাড়িয়ে উচ্চতর তলের
গান্ধী রোডের ওপরে নজর রাখছে ।
ম্যালের দিকে না গিয়ে আমি উল্টো পথে হাঁটা শুরু করলাম গান্ধী রোড বরাবর ।এর
আগের বার কলেজের তরফ থেকে “হিমালয়ান গ্লোরি” নামে যে হোটেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেই হোটেলটি ছিল এই
গান্ধী রোডের ওপরে অবস্থিত । হোটেলটার কথা মনে পড়তেই যেন মন কেমন করে উঠল তার জন্য
। ইচ্ছে হোল একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি হোটেলটার কি হাল হয়েছে এতদিনে । অসম্ভবের
স্বপ্নে মশগুল মন বলে উঠল... “হয়ত গিয়ে দেখতে পাবে বন্ধুরা হোটেলে ঢোকার মুখে সিঁড়ির ওপরে বসে গুলতানি
করছে এখনও । হয়ত তাদের কেউ তোমায় দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠবে – এইইইইই কি
পাগলের মত একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছিস ।আয় আমাদের সঙ্গে যোগ দে” । কিন্তু হায়
! কোথায় সে হোটেল ! গান্ধী রোডের প্রায় শেষ মাথা অবধি হেঁটেও তাকে খুঁজে পেলামনা ।
বিফলমনোরথ হয়ে ফিরে আসতে গিয়ে একটা দোকানের সামনে
একজন বয়স্ক লোককে বসে থাকতে দেখে মনে হল এই লোকটিই হয়ত আমায় বলতে পারবে
পুরনো হোটেলটা আদৌ টিকে আছে না উঠে গেছে ।
আমার অনুমানে ভুল হয়নি । আমার প্রশ্ন শুনে লোকটি জানাল – “হোটেল টা এখনও
চালুই আছে। তবে সেতো এ রাস্তায় নয় ।গান্ধী রোডের ঠিক ওপর দিয়ে যে রাস্তাটা আছে হিমালয়ান
গ্লোরি হোটেল সেই রাস্তায়”। সে মোকামে পৌঁছনর উপায় ও বাৎলে দিল সেইই । যে দিক থেকে এসেছি সেই দিকেই
সামান্য কিছুটা পিছিয়ে গেলে রাস্তার ডানহাতে একটা পানদোকান পড়বে ।সেই পানদোকানের
পিছনে গলিটার মুখ ।সেই গলিতেই হিমালয়ান গ্লোরি হোটেল । স্মৃতি হাতড়ে মনে পড়ল বটে
যে আগেরবার আমরা গান্ধী রোডে ল্যান্ডরোভার গাড়ি থেকে নেমে নিজের মালপত্র কাঁধে করে
একটা স্লোপ বেয়ে হোটেলের মূল প্রবেশ দ্বার অবধি । এবার আর রাস্তাটাকে খুঁজে পেতে
বেগ পেতে হলনা । যদিও এই আবর্জনায় ভরা কাঁচা রাস্তাটাই যে সেকালের সেই স্লোপ কিনা
তা নিশ্চিত করে কে বলবে আমায় – মনের মধ্যে খুঁতখুঁতুনি নিয়েই উঠতে লাগলাম সেই রাস্তা ধরে ।
“তাই
চারি দিকে চায় ,মন কেঁদে গায় এ নহে , এ নহে ,নয় গো ...”
হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে গেল হোটেলটায় ঠিক ঢোকার মুখেই কয়েকধাপ সিঁড়ি ছিল ।যে
কদিন আমরা দার্জিলিং এ ছিলাম তার প্রায় অধিকাংশ দিনই দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর আমরা
অনেকেই এসে বসতাম সেই সিঁড়ির ধাপে । রোদ
পোহানর সঙ্গে সঙ্গে চলত দেদার আড্ডা ,পরস্পরের পা টানাটানি ।মেয়েরাও পিছিয়ে
ছিলনা,তারাও এসে যোগ দিত সেই দ্বিপ্রাহরিক আড্ডায় । আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে চোখ চলে
যেত সামনের গান্ধী রোডে রঙ বেরঙের পোষাক পরা স্থানীয় নারী পুরুষের অবিরাম আনাগোনা
। তাদের চাল চলনে মনেই হতনা যে তারা কোথাও যাবার জন্যে ঘর ছেড়ে বেরিয়েছে । এক ঝাঁক
স্থানীয় তরুণীকে অলস পায়ে সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে দেখে গীতশ্রী তো একদিন বলেই
ফেলল “এই
দ্যাখ , এরা বোধ হয় ফ্যাশন প্যারেডে বেরিয়েছে” । সেই কোন
কালের কথাটা হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ায় নিজের মনেই হেসে উঠলাম ।গীতশ্রী বরাবরই ওই রকম প্রাণপ্রাচুর্যে
ভরা খোলামেলা স্বভাবের মেয়ে ছিল । আর ওই আনন্দোচ্ছল স্বভাবের জন্যেই সবাই ওকে খুবই
পছন্দ করত । গড়পড়তা বাঙালি মেয়েদের তুলনায় ও ছিল খর্বকায় । বোধহয় সেই জন্যেই কলেজে
আমরা ওকে সকলে বেবি বলেই ডাকতাম ।
মনে পড়ে গেল সামনের রাস্তার ওপারে একফালি খোলা জমি ছিল ।সেই খোলা জমিতেই
এসে দাঁড়িয়েছিল আমাদের ল্যান্ডরোভার ।পরে ওই জায়গাটাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল কোথাও বেড়াতে
বেরনোর আগে আমাদের সমবেত হবার জায়গা । প্রতিদিন সকালে ওই খোলা জায়গাটাতে সকলে এসে
জড়ো হবার পর একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়া হত । জায়গাটার এক পাশে ছিল অগুন্তি ধাপওয়ালা একটা সিঁড়ি । ওপরে দাঁড়িয়ে
সেই সিঁড়ির নিচের দিকে তাকালে মনে হত সিঁড়িটা যেন একেবারে পাতালে নেমে গেছে ! কল্পনায়
যত রঙই চড়াইনা কেন বাস্তবে সিঁড়িটা নেমে গিয়ে শেষ হয়েছে নিচের বাজারে । আমরা বেশ
কয়েকবার বাজারে ওঠা নামা করেছি ওই সিঁড়ি দিয়ে । যেমন এবারেও আমাকে
ট্যাক্সিস্ট্যান্ড থেকে হোটেলে পৌঁছনর জন্য উঠতে হয়েছে ওই রকমই অন্য আর একটি
সিঁড়িদিয়ে । সেই খোলা জায়গাটা উধাও হয়ে গেছে কবেই । বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে
ঊঠল । পরে অবশ্য হারিয়ে যাওয়া খোলা জায়গাটার পুরনো অবস্থান নির্ণয় করতে পেরেছিলাম সিঁড়িটাকে
খুঁজে পাবার পর ।
অবশেষে স্মৃতির সরণী বেয়ে আমার চলা
শেষ হল । আমার সামনে হলদে রঙের এক পুরনো ধাঁচের বাড়ি ।দেখে বোঝা গেল বাড়িটাতে অনেক
দিন কেউ বাস করেনা । সামনের বাগানের গোটাটাই আগাছার জঙ্গলে ভরে গেছে ,লোহার গেটে
লতিয়ে উঠেছে বুনো লতা গাছ । গেটের দুপাশে ফাটল ধরা ভগ্নপ্রায় ইটের পিলারএর একটিতে
মারবেল ফলকে দেখলাম বাঙ্গালী গৃহস্বামীর নাম ও বাড়ির প্রতিষ্ঠার সাল তারিখ খোদাই
করা রয়েছে । তারিখটি দেখে বুঝলাম আমরা এখানে ঘুরে যাবার পরে বাড়িটি তৈরী হয়েছে
।হলদে রঙের বাড়িটার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আমার চোখে পড়ল বাঁদিকে বিশাল লন ওয়ালা ঝাঁ
চকচকে একটা রিসোর্টের দিকে । তার গেটের কাছে লাগান সাইনবোর্ডে বড়বড় অক্ষরে নাম
লেখা “হিমালয়ান
রিসোর্ট”
যে প্রবীন দোকানদার আমাকে এই রাস্তার হদিস দিয়েছিলেন তিনি বোধ হয় হিমালয়ান গ্লোরি হোটেল বলতে এই হিমালয়ান
রিসোর্টের কথাই বলেছিলেন আমায় । হয়তো সেই পুরনো হোটেলটাকে ভেঙে ফেলে তার ওপরে গড়ে
উঠেছে এই আধুনিক রিসোর্ট । একটু জিজ্ঞাসাবাদ করে একেবারে নিশ্চিত হয়ে নিতে মন
চাইলনা । নিজের অজান্তেই বুকের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ।আমাদের জীবনের কিছু
সোনালি মুহূর্তের কত ছবি ওই ইমারতের তলায় চাপা পড়েগেছে চিরকালের জন্য । ধীর পদে
নেমে এলাম নীচের গান্ধী রোডে ।সেখান থেকে ফিরে চললাম তেমাথার মোড়ে । তেমাথার মোড়
থেকে যে রাস্তাটা ম্যালের দিকে চলে গেছে সেই রাস্তাটা ধরে আনমনে হেঁটে যেতে যেতে কানে
এল গানের সুর । একটু এগোতেই চোখে পড়ল রাস্তার বাঁ ধারের একটা দোকানের দরজার এক
পাশে রাস্তার ওপরে বসে একটি লোক সারেঙ্গির মত একটা যন্ত্র বাজিয়ে গান গেয়ে চলেছে ।
কান পাতলাম –
কিন্তু অনেক চেষ্টা করা সত্বেও গানের কথা গুলি বুঝতে পারলাম না । গানের সুরটাও
কেমন যেন ঘুমপাড়ানি গানের মত একঘেয়ে ।বিশেষ ওঠাপড়া নেই সে সুরে – পঞ্চম থেকে
তার সপ্তকের ষড়জ –
এই পরিধির মধ্যেই ঘোরাফেরা করছিল গায়কের কন্ঠস্বর । সঙ্গতকারি যন্ত্রটি সারেঙ্গির
মত দেখতে হলেও তার আওয়াজটা সারেঙ্গির মাধুর্য অনুপস্থিত । একটু মোটা গান গাইতে
গাইতে লোকটি যন্ত্রটিকে কোলের ওপরে ধরে তারের ওপরে ছড় চালিয়ে যে সুর তুলছিল তা গানের
সুরের অনুবর্তন করছিলনা । অথচ কন্ঠ আর যন্ত্রের সুর কোন এক অশ্রুত আত্মীয়তা সুত্রে
যেন বাঁধা ছিল । আর তাই সে গান বেসুরো মনে হয়নি । নিজের সংগীতচর্চার অভিজ্ঞতা দিয়ে
বুঝতে পারি কাজটি কত কঠিন । গায়কের সামনে একটা চাদর পাতা – তার ওপরে কিছু
খুচরো পয়সা পড়ে রয়েছে দেখে পকেট থেকে একটা পাঁচটাকার কয়েন বের করে সেই চাদরে ফেলে
দিয়ে এগিয়ে চললাম ।
রাস্তাটার বাঁপাশের অভিজাত দোকানগুলির অনেক কটাই বেশ
প্রাচীন ।তাদের কাচের শো কেসে সাজান নানা রকমের কিউরিও –
তার দাম ও বেশ চড়া । এ দোকানগুলিতে সাধারনত বিদেশী পর্যটকেরাই বেশি কেনাকাটা করে ।
উল্টোদিকে সার সার অস্থায়ী ঝুপড়ি দোকান । বাঁশের খাঁচার মাথায় ত্রিপলের ছাউনি –
তার তলায় তক্তপোষের অপরে সাজানো নানান
মনোহারী পশরা । উলের সোয়েটার , চামড়ার
জ্যাকেট , পশমের টুপী , কম্বল , খেলনা , দার্জিলিং এর পাথর – কি
নেই সেখানে ! আর ভীড় ও উপচে পড়েছে সে সব দোকানে । বেশ লাগছিল সেই বিকিকিনির হাটের
মাঝে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াতে । তবে একটা সময়ে অনুভব করলাম সন্ধ্যা নেমে
এসেছে –
ঠান্ডাও বাড়তে শুরু করেছে সূর্যাস্তের পর থেকে । আর এগিয়ে ম্যালে যেতে ইচ্ছে করলনা
।ফিরে চললাম পান্থশালায় ।
৩
সকালে ঘুম ভেঙে প্রথমেই মনে পড়ল কাঞ্চনজঙ্ঘার কথা । যদিও
দার্জিলিং এ কাঞ্চনজঙ্ঘাকে স্বমহিমায় দেখতে পাওয়া যায় অনেক বেলা অবধি – গতকাল এখানে পৌঁছে
তার দেখা পাইনি । আশাছিল পরের দিন ভোরবেলা ঘুমচোখ খুলেই নতুন করে তার সঙ্গে
শুভদৃষ্টি হবে ।সেই উৎসাহে প্রবল ঠান্ডার ভ্রূকুটি কে উপেক্ষা করে এক ঝটকায় কম্বল
সরিয়ে বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম । ঘরের ছোট্ট জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম – পিছনের বাড়ির
ছাদের আড়াল গলে যেটুকু আকাশ দেখা যায় সেই দিকে দৃষ্টি মেলে দিলাম – কিন্তু কোথায়
কাঞ্চনজঙ্ঘা ! মাথার ওপরে ঘন নীল আকাশে
,চারপাশের বাড়ির দেওয়ালে , গাছের মাথায় প্রভাতী রোদ্দুর ঝলমল করছে অথচ
দিগন্তেরেখার প্রান্তে যেখানে গিরিরাজ হিমালয়ের সোনার মুকুট সকালের নরম রোদ্দুরে
ঝিকিমিকি করতে থাকে তা ঘন কুয়াশায় মোড়া । কেমন যেন ঘোলাটে ভাব । নিশিতে পাওয়া
লোকের মত ঘরের বাইরে বেরিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এলাম , তবু সে অধরাই রয়ে গেল । উপায়
নেই –
পাহাড়ের খেয়ালি প্রকৃতি এমনই । এই আছে এই নেই – দুনিয়ার কোন আদালতে এর বিরুদ্ধে নালিশ
চলেনা ।
কাজেই মনে ক্ষোভ জমিয়ে রেখে লাভ নেই । দ্রুত একতলার রেস্তরাঁয়
বসে জলখাবারের পাট চুকিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ম্যালের উদ্দেশ্যে । তেমাথায় পৌঁছে
বাঁদিকের রাস্তাটা চলে গেছে ম্যালের দিকে।সেদিকে ঘুরতে চোখে পড়ল এই রাস্তাটার
ওপরের ধাপে একটা টী প্ল্যান্টারস এ্যাসোসিয়েশনের পরিচালনাধীন একটা হাসপাতাল ।দূর
থেকে ব্যারাকের মত বাড়িটার চেহারা দেখে মনে হল হাসপাতালটা হয়ত সেই বৃটিশ আমলে তৈরী
। রাস্তার ধারের বড় দোকান গুলো খোলেনি তখনো – অন্য ধারে ঝুপড়ি দোকানগুলোতে দোকানিরা
সবে বসতে শুরু করেছে ।রাস্তায় ভীড় ও নেই ।কেবল ছোট ছোট দলে স্কুল পড়ুয়া ছেলে
মেয়েরা নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতে চলেছে স্কুলের পথে । তাদের ইউনিফর্মের
পারিপাট্য দেখে তাদের কোন অভিজাত স্কুলের পড়ুয়া বলেই মনে হল । ছেলেরা পরেছে হাল্কা
নীলচে রঙের প্যান্ট ,ঊর্ধ্বাঙ্গে গাঢ় শ্যাওলা রঙের ব্লেজার ও টাই । ব্লেজারের বুক
পকেটে স্কুলের ব্যাজ । মেয়েদের স্কার্টের সঙ্গে ছেলেদের মতই ব্লেজার ও টাই ।
প্রত্যেকের পিঠে স্কুল ব্যাগ । সকালের নরম রোদ্দুরে কচি কচি মুখ গুলোকে ফুলের মতই
তাজা আর সুন্দর লাগল ।


No comments:
Post a Comment